ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

লাইসেন্সহীন ১৩ লাখ বাইক চালক

প্রকাশনার সময়: ২২ মে ২০২২, ১৫:৪৮

দেশে গণপরিবহনের বিকল্প যান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে মোটরসাইকেল। যা রীতিমতো অবাক করে তুলেছে দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের। প্রতি বছর নিবন্ধন করা মোটরসাইকেলের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও বাড়ছে না চালকের লাইসেন্স। দেশে মোট ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেলের নিবন্ধনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

অথচ এর বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া চালকের সংখ্যা ২৩ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ ১৩ লাখ মোটরসাইকেল চালানো অনুমোদন নেই। সংস্থাটি বলছে, ২০১৮ সালে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৫, ২০১৯ সালে চার লাখ ১৪ হাজার ৫২, ২০২০ সালে তিন লাখ ১১ হাজার ১৬, ২০২১ সালে তিন লাখ ৭৫ হাজার ২৫২ এবং চলতি বছরের শুধু জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৮৪ হাজার ৫৮৩টি মোটরসাইকেলের। মোটরসাইকেল চালানোর অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে চালকের দক্ষতা নিয়ে। মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্তির মধ্যকার সমন্বয়হীনতার দায় না নিয়ে উল্টো সড়ক দুর্ঘটনায় অধিক প্রাণহানির জন্য এ বাহনকে দায়ী করছে বিআরটিএ।

তারা বলছে— গঠনগতভাবে মোটরসাইকেল অপেক্ষাকৃত একটি অনিরাপদ বাহন। স্বল্পমূল্যে মোটরসাইকেল পাওয়ায় ওভার স্পিডে ঝুঁকছে তরুণ সমাজ। একদিকে যেমন ভ্রুক্ষেপ নেই ট্রাফিক আইনের, অন্যদিকে প্রতিযোগিতা করে চলে ওভারস্পিডের লিমিট। সড়কে হঠাৎ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এসব অদক্ষ মোটরাসাইকেল চালকদেরই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বিগত বছরের তুলনায় বর্তমান সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এর ভয়াবহতা বেশি পরিলক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। সড়কপথে উন্নয়নের প্রভাবে ফাঁকা সড়কে মোটরসাইকেলের ওভার স্পিডে প্রতি আসক্ত তরুণ তারা। স্বল্পমূল্যে হাতের নাগাল মোটরসাইকেল পাওয়া, পিতা-মাতার কাছে আবদার করে অথবা একপ্রকার চাপ প্রয়োগ করে এমনকি জিম্মি করে পছন্দসই ব্র্যান্ডের মডেলের মোটরসাইকেল কিনে রাস্তা কাঁপিয়ে তুলছে। উঠতি বয়সি এইসব তরুণ স্বভাবতই রাস্তার কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট ছাড়াই রাস্তায় নেমে নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের জীবনকেও হুমকির সম্মুখীন করছে। বর্তমান সমাজে অনেক পিতা-মাতাই তাদের একমাত্র সন্তানকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যাক মানুষের হতাহতের ঘটনা নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন টিভির স্কোল বা পত্রিকার পাতা খুললেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবর সামনে আসে। শুধু দুর্ঘটনার খবরই নয় এসব দুর্ঘটনায় আহত বা মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হওয়া বেশিরভাগ তরুণ-যুবক সমাজ। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো যেন তাদের নিয়মিত অভ্যাসের পরিণত হয়েছে। অবস্থা এমন যে, হিন্দি কিংবা ইংলিশ মুভির হিরোদের মতো লোক দেখানোর জন্য, কারো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কিংবা কয়েক মিনিট সময় আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মোটর বাইকের স্পিড তুলতেই হয়।

ইমরান কবির (ছদ্মনাম)। একটি বেসরকারি হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বাবা ব্যবসায়ী। বন্ধু তাকে মোটরসাইকেল চালাতে না দেয়ায় বাবার কাছে জেদ করে মোটরসাইকেলের জন্য। পরে তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেয়া হয়। প্রতিদিন স্কুলে মোটরসাইকেল নিয়ে যাতায়াত করে এবং ফাঁকা রাস্তা পেলেই গাড়ির স্পিড থাকে ১০০ তে। ইমরান কবির নয়া শতাব্দীকে বলে, মোটরসাইকেলে উঠলেই মাথা ঠিক থাকে না। একদিকে দামি মোটরসাইকেল তারপর আবার ফাঁকা রাস্তা পেলেই স্পিডে চালাইলে অনেক মজা লাগে। সবাই তাকিয়ে থাকে আমার বাইক চালানোর দিকে। স্কুলে বাইক নিয়ে গিয়ে স্কুলের মাঠে জোরে টান দিয়ে গেলে সবাই হা করে তাকিয়ে থাকে এগুলো আমার অনেক ভালো লাগে।

ওভারস্পিডে গাড়ি চালিয়ে মজা পাওয়ার চিন্তা-চেতনা শুধু ইমরান কবিরের একাই নয়। এমন আরো হাজার তরুণ-যুবক আছে, যারা জীবনের ঝুঁকি সঙ্গে করে নিয়ে ওভার স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নিজেদের মৃত্যুর দিকে অগ্রসর করছে। এসব তরুণ-যুব সমাজ মোটরসাইকেল ক্রয় করে কম বয়সী ভেবে চালকের অনুমোদন পাবে না ভেবে তারা আবেদন থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে তাদের চালকের অদক্ষতার সঙ্গে বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি।

কথা হয় রায়হান রাজ নামে মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তিনি নয়া শতাব্দীকে বলেন, মোটরসাইকেল কিনছি বটে, লাইসেন্স করা হয়নি। মোটরসাইকেলের কাগজ করতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। আমার বয়স কম জাতীয় পরিচয় পত্র ছিল না তাই আবেদন করতে পারিনি। এখন জাতীয় পরিচয় হাতে পেয়েছি তাই চিন্তা করছি আমাকে যদি চালকের অনুমোদন না দেয় তখন? শুধু টাকা নষ্ট হবে। তাই ভাবছি আরো দুই বছর পর চালকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করবো, তার আগে করবো না।

জানতে চাইলে বিআরটিএর মুখপাত্র (পরিচালক, রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, দেশে মোট ১৩ লাখ চালকের লাইসেন্স নেই। মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইনে কোনো বাধ্যবাধকতা নাই যে ড্রাইভিং লাইসেন্স কম বলে বা নাই বলে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন দেয়া যাবে না। আমরা যে পরিসংখ্যান দিয়েছি, বাস্তবতার নিরিখে বৈধ চালকের সংখ্যা আরো কম হবে।

তিনি বলেন, জরুরি প্রয়োজনে স্বল্পদূরত্বে যেতে মোটরসাইকেলের ব্যবহার হলেও বর্তমানে এসব যান মহাসড়ক ও দূরপাল্লায় চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সমপ্রতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেক বেড়েছে। হাইওয়েতে মোটরসাইকেল চালাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। মোটরসাইকেল চালানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে হেলমেটসহ যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, নিয়ম না জানা বা না মানা প্রভৃতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই আমরা মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি। তারা যেন নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে হাইওয়েতে মোটরসাইকেল না চালান। এটা করলে তো ভালো। চালালে তারা যেন নিরাপত্তার সব সরঞ্জাম ব্যবহার করেন, আমরা সেই পরামর্শ দিচ্ছি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউমোটর পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হাদিউজ্জামান নয়া শতাব্দীকে বলেন, লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইনে বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ১৩ লাখ চালকের যে লাইসেন্স নেই এটা দুঃখজনক বিষয়। এই বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালকদের লাইসেন্সের প্রতি উৎসাহ বাড়াতে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথে আসতে হলে প্রথমে মোটরসাইকেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই চালককে লাইসেন্স দেখাতে হবে, মোটরসাইকেল নিবন্ধন করতে হলে লাইসেন্স বা মোটরসাইকেল ক্রয় করে নিবন্ধন করে লাইসেন্স নিতে হবে। ছেলেকে মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। তারা জানেনই মোটরসাইকেল চলাচলে জীবনের ঝুঁকিটা কতটুকু। এ বিষয়ে অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। এই বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখলে অবশ্যই এই পথ থেকে পরিত্রাণ মিলবে আমরা আশাবাদী।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ