ঢাকা, বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কারখানা বন্ধের শঙ্কা, হুমকিতে বিনিয়োগ

প্রকাশনার সময়: ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০:১৬

গ্যাসের অভাবে হুমকির মুখে দেশের বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকায় এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় তা অপেক্ষাকৃত আরো বেশি। অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে কারখানা বন্ধের বিবেচনা করছেন অনেক মালিকই।

গ্যাস সংকটের সমাধান চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে দীর্ঘদিন ধরে দেনদরবার করলেও এখনো তেমন কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে এই পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প-কারখানার মালিকগণ।

অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করারও অনেক প্রতিষ্ঠান গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহ করছে না। আর চাহিদা মতো গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বেড়ে যাচ্ছে শিল্প উৎপাদন খরচও।

এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে শিল্প মালিকরা বাধ্য হয়েই ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করলেও শিল্প-কারখানায় হিসাব মিলাতে পারছেন না অনেক শিল্প-কারখানার মালিক। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধের চিন্তাভাবনা করছেন তারা। লিটল স্টার গ্রুপের মালিকানাধীন সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস লিমিটেডের অনুমোদিত গ্যাসের প্রেসার ১০ পিএসআই হলেও দিনের বেলায় বেশিরভাগ সময়ই তা ২ থেকে ৩ পিএসআই মধ্যে থাকে।

সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি তা ২ এর নিচে নেমে আসে। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা, পণ্যের মান খারাপ হওয়া ও দামি মেশিনারির ক্ষতি হওয়াসহ গত চার বছরে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার উৎপাদন লোকসান হয়েছে এই কোম্পানির।

দুই সপ্তাহ আগেই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে সমাধান চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)—এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধও জানিয়েছেন।

খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা আর পারছি না। সম্ভবত কারখানাটি বন্ধই করে দিতে হবে’। তিনি বলেন, ৩ কোটি টাকা খরচে নিজের কারখানা পর্যন্ত গ্যাসের লাইন নিয়েছেন। কিন্তু তিতাস কর্তৃপক্ষ মাঝপথে অন্তত ৫টি কারখানাকে ওই লাইন থেকে সংযোগ দিয়েছে। ফলে আমি কারখানায় গ্যাসের প্রেসার পাই না, বলেন তিনি। কেবল লিটল স্টার স্পিনিং নয়, টেক্সটাইল ছাড়াও গ্যাসনির্ভর এ খাতের ডায়িং, ফিনিশিং, প্রিন্টিং পোশাকসহ অন্যান্য খাতের বেশ কিছু ইউনিট অনেকদিন ধরেই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছে।

বিটিএমএ সূত্র জানায়, অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠান তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদনে ক্ষতির কথা জানিয়েছে চিঠি পাঠিয়েছে। লিটল স্টার স্পিনিং লিমিটেড ছাড়াও এ তালিকায় রয়েছে মোশারফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, এপেক্স উইভিং মিলস ও হোমটেক্সটাইল। এর বাইরে ওফাজউদ্দিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, মিথেলা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এম. হোসেন স্পিনিং মিলস, আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস, এম এ এইচ স্পিনিং মিলস লিমিটেড, আলহাজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, রাইজিং স্পিনিং মিলস, আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, মুন্নু টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড বড় ধরনের গ্যাসের সংকটের সম্মুখীন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘ আলোচনার পরও সমাধান না হওয়ায় এখন আর অনেকে ত্যাক্তবিরক্ত হয়ে সমস্যার কথা জানাতেও চান না। এর মধ্যে কতিপয় কারখানা বিকল্প উপায়ে কিছু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, নয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখা কিংবা কমিয়ে দিতে হচ্ছে। তবে পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে, সামিট এফএসআরইউর ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন এখনো মেরামত না হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো এক মাস সময় লাগবে।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, দেশে এরই মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও শিল্প-কারখানাগুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। দেশের সার্বিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে নতুন শিল্প-কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া জরুরি।

জানা গেছে, গ্যাসের অভাবে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা এরই মধ্যে ৬০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। আর বন্ধের অপেক্ষায় ধুঁকছে আরো ২০ শতাংশ শিল্প-প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর পাশেই জিনজিরা, শুভাঢ্যা, মান্দাইল, কালিন্দী, বারিপুর ও খোলামুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ২ হাজার ছোট ও মাঝারি শিল্প-প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, নারায়ণগঞ্জ, কোনাবাড়ি, সফিপুর, জয়দেবপুর ও আশুলিয়ায় ছোটবড় আরো ৮ শতাধিক শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাস সংকটে ডাইং, কম্পোজিট, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, কটন মিল, স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা চলছে ধুঁকে ধুঁকে। একই অবস্থা বিরাজ করছে পাট, স্টিল, রিরোলিং ও সিমেন্টসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিভিন্ন শিল্প-কারখানায়ও।

কারখানা মালিকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় অর্ধেকও গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণেই ছোট-বড় শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক কারখানা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে কোনো রকমে লোকসান বোঝা মাথায় নিয়ে টিকে রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না, বরং বিদ্যমান উৎপাদন বিপর্যয় ঠেকাতেই কারখানা মালিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান শিল্প-কারখানার মালিকরা।

হঠাৎ গ্যাসের প্রেসার কমে যাওয়ায় ডায়িংয়ে থাকা কাপড়ের রঙের হেরফের হওয়ায় ওইসব কাপড়ও ডিসকালার হয়ে যায় বলে জানান দেশের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল মিল মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন। তিনি তার উৎপাদনের কিছু অংশ নিজস্ব উপায়ে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান।

সমস্যা নিয়ে কয়েক দিন আগেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা কোনো সমাধান দিতে পারছে না। আমার সঙ্গে ১৫ পিএসআইয়ের চুক্তি হলেও তা আমাকে দেয়া হচ্ছে না। তাহলে আমার ব্যাংক ঋণের টাকা কে দেবে?’

আঞ্চলিক বিপণন বিভাগ-গাজীপুরের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ইঞ্জিনিয়ার কামরুল হাসান নয়া শতাব্দীকে জানান, ভোক্তাদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পেলেই তারা চাপের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, বিভিন্ন শিল্পে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান স্টোরেজ এবং রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করেছে সরকার। ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফ (মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি, দুটি এফএসআরইউএস প্রতিদিন ৬৫০ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ করত। কিন্তু গত বছরের ১৮ নভেম্বর মুরিং পাইপলাইনে ক্ষতির কারণে সামিট গ্রুপের মালিকানাধীন ও পরিচালিত একটি এফএসআরইউ এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। আবার সামিট এফএসআরইউ বন্ধের কারণে দেশের গ্যাস সঞ্চালন লাইনে প্রায় ১৫০ এমএমসিএফ থেকে ২০০ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পরে তিতাস গ্যাসের বিতরণ এলাকায়ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের ১ হাজার ৮০০ এমএমসিএফ থেকে কমে ১ হাজার ৫১৮ এমএমসিএফ-এ নেমে আসে।

এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস জানায়, আগামী ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের নিম্নচাপ লক্ষ্য করা যাবে। সূত্র জানায়, দেশে উৎপাদিত গ্যাসের বেশিরভাগই ব্যবহূত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও সার কারখানায়। অবশিষ্ট গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে শিল্প-কারখানায়। সরকার এর আগের মেয়াদে গ্যাস সংকট কমাতে ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে সারাদেশে গ্যাসের নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ বন্ধ করে দেয়। তারপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে সংযোগ দিতে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৩ সালে থেকে আবার নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান সাংবাদিকদের জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ কমে যায়। ফলে তারা বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের নিম্নচাপ লক্ষ্য করেছেন।

নাজমুল আহসান বলেন, ‘আশা করছি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এফএসআরইউর ক্ষতি মেরামত করা হবে এবং আমরা ওই মাসের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ করতে পারব।’

গ্যাস সংকটের জন্য উদ্যোক্তারা তিতাস কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করে শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, টেক্সটাইল শিল্প তুলনামূলক বড় বিনিয়োগের। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে আর্থিক ক্ষতি বাড়তে থাকলে তাদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দেবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে গেলে ‘তাদের’ (গ্যাস কর্তৃপক্ষ) তো কোনো সমস্যা নেই।’

উদ্যোক্তারা জানান, মাঝে মধ্যে হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। সংকট কাটাতে ব্যাপকভাবে এলএনজি আনার কথা বলা হলে প্রকৃতপক্ষে তাতে অগ্রগতি নেই।

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়