ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিধিনিষেধ শুধু কাগজে-কলমে

প্রকাশনার সময়: ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৩৬

দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হলেও পরিকল্পিত ছক না থাকায় তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই গোলক ধাঁধাঁয় পড়েছে। তাই বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত সব কার্যক্রমই এলোমেলোভাবে চলেছে।

রাস্তাঘাটে সঠিকভাবে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামলেও অতি নগন্যসংখ্যক পথচারীকে জরিমানা করার মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়। অথচ রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, গণপরিবহন ও রেস্তোরাঁসহ সবখানেই সব ধরনের বিধিনিষেধ চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১১ জনকে ২৫৫০ টাকা জরিমানা ও ২০ জনকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আড়ায় ঘণ্টা ধরে শাহাবাগ এলাকায়ে এ অভিযান চালানো হয়। পরবর্তীতে আরো কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা।

অন্যদিকে উন্মুক্ত স্থানে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ বন্ধ রাখতে বলা হলেও তা আগের তালেই চলেছে। ট্রেন, বাস এবং লঞ্চে সক্ষমতার অর্ধেকসংখ্যক যাত্রী নেওয়া এবং সব ধরনের যানের চালক ও সহকারীদের করোনা টিকা সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও কেউই এসবের থোড়াই কেয়ার করেনি।

রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খেতে এবং আবাসিক হোটেলে থাকতে করোনা টিকা সনদ প্রদর্শন করার নির্দেশনা থাকলেও কোথাও কেউ তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে তা শোনা যায়নি। সরকার ঘোষিত ১১ দফা নির্দেশনায় করোনার টিকা এবং বুস্টার ডোজের গতি বাড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় প্রচার এবং উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হলেও এ ধরনের কোনো তৎপরতা কোথাও চোখে পড়েনি।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে দেশের করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কেননা করোনার হটস্পট খোদ রাজধানীতেই বাণিজ্য মেলা, পিঠা উৎসব, রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে। ঢাকার উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ষষ্ঠ দফা ইউপি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটছে। যার সবকিছুই ১১ দফা নির্দেশনার বিপরীত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সব সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টিকার সনদ দেখিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার নির্দেশনা ‘অবাস্তব’ বলে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সাফ জানান দিয়েছে। কোভিড-১৯বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরার্মশক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, বাণিজ্য মেলার মতো জায়গায় কখনোই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়।

তাঁর ভাষ্য, বাণিজ্য মেলাকে আরও সফল করার জন্য, আরও জনসমাগম বাড়ানোর জন্য আয়োজন চলছে- যা ১১ দফা নির্দেশনা সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে বাণিজ্য মেলা ঘুরে যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা যে অমূলক নয় তা অনেকটাই স্পষ্ট।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা পরিচালনা করার কথা বলা হলেও সেখানকার প্রতিটি স্টলেই ক্রেতাদের গাদাগাদি করে বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। মেলায় আগতদের বেশিরভাগের মুখে মাস্ক না থাকলেও এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে শোনা যায়নি। এমনকি স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের মুখে মাস্ক পরার ব্যাপারেও মেলা কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি ছিল না।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, যেকোনও জনসমাবেশ করোনার উৎপত্তিস্থল, এটা আমরা সবাই জানি। ওমিক্রণের সংক্রমণ গতি ডেল্টার তুলনায় পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশি। এর মধ্যে ১১ দফা জারি এবং বর্তমানে দেশের মধ্যে যা চলছে, এই দু’য়ের মধ্যে কোনো মিল নেই।

ওমিক্রন ও ডেল্টাসহ যেকোনও ভ্যারিয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। আর তা না করে যদি কাগজে ১১ দফা জারি করেই সরকার বসে থাকে, তাতে জাতি আবার ডেল্টার সময়ের মতো ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে।

এই জনস্বাস্থ্যবিদ অভিযোগের সুরে বলেন, শুধু দেওয়ার জন্যই ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কে বাস্তবায়িত করবে, কে তদারকি করবে- এর কোনটিই কোনো নির্দেশনা নেই। তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় এসব নির্দেশনা শুধু নথিতেই বন্দি থাকবে। ১১ দফা বাস্তবায়নের জন্য একটা সমন্বিত, সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার, যেটা আগেও হয়নি, এখনও হবে না- বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশে জোরেশোরে চলছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন; সভা সমাবেশ। জনবহুল নগরী নারায়গঞ্জসহ দেশের হাজারো গ্রামীণ জনপদ প্রচার প্রচারণায় মুখরিত। করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতির পরও নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচন স্থগিত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে ওয়াজ মাহফিল শুনছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অগনিত মানুষ কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে বিয়েসাদিসহ সামাজিক নানা অনুষ্ঠান যোগ দিচ্ছে।

অন্যদিকে টিকাদান কর্মসূচীর গতি আগের মতই ঢিলেতালে চলছে। টিকা প্রদান ১০ কোটির মাইলফলক ছুঁলেও, প্রাধিকার তালিকায় গ্রামীণ নিম্নবিত্ত বয়োবৃদ্ধ, শিশুদের অনেকই এখনো দুই ডোজ এমনকি এক ডোজের সুরক্ষা বলয়েও ঢোকেনি। অথচ তাদের বাদ রেখে গুটিকয়েক শহুরে সুবিধাভোগীদের বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা ভীষণভাবে বৈষম্যমূলক।

প্রবীণ এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে প্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনা জরুরি। টেনে ধরতে হবে জনসমাগমের লাগাম। সরকারের দেওয়া ১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে নজরদারি জোরদার করারও তাগিদ দেন তিনি।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে নগরবাসী সবাই আগের মত গা ছাড়াভাবে চলছে। বেশিরভাগ মানুষের মুখেই মাস্ক নেই। কেউ কেউ আবার তা মুখে, গলায় কিংবা থুতনিতে ঝুঁলিয়ে রেখেছে। অনেকে মাস্ক পকেটে নিয়ে ঘুরছে। ভ্রাম্যমান আদালত দেখলে তাড়াহুড়ো করে তা মুখে লাগাচ্ছে।

এদিকে বিবধিনিষেধে সব ধরনের যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আবশ্যিকভাবে করোনার টিকা সনদ থাকার কথা বলা হলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ চালক-সহকারী এখনও টিকাই নেননি। সেই সঙ্গে মাস্ক পরতেও তাদের অনীহা দেখা গেছে। রামপুরায় আবাবিল পরিবহনের চালক মুস্তাক হাসান জানান, তিনি করোনার কোনো টিকা এখনও নেননি। মাস দু’য়েক আগে সুরক্ষা অ্যাপসে টিকার নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু টিকা নেওয়ার খুঁদে বার্তা পাননি। তবে তার সহকারি মোজাম্মেল এক ডোজ টিকা নিয়েছে। তার কাছে সনদও আছে। মুস্তাকের দাবি, গাড়ির চালক ও সহকারির টিকা সনদ বাধ্যতামূলক করার আগে টিকাদান কর্মসূচী গতিশীল করা জরুরি। যাতে আগ্রহী যে কেউ সহজে টিকা নিতে পারে। তা না হলে এ ধরণের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি। ট্রান্সসিলভা, মেঘলা, মালঞ্চ, বিআরটিসি, ওয়েলকাম, বিকল্প, খাজাবাবা, বসুমতি শিকড়সহ আরও কয়েকটি পরিবহনের বাসের চালক ও সহকারীর সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। তাদের বেশিরভাগই টিকা নিতে আগ্রহী হলেও তা পাননি বলে জানান। ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জীব দাশ বলেন, মাঝে বেশ কিছু দিন মানুষ কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল না। নতুন করে আবার তা মানায় অভ্যস্ত হতে একটু সময় লাগবে। এই বিবেচনায় প্রথম দিন অনেকটা নমনীয় অবস্থানেই ছিল পুলিশ। আগের মতোই লোকজন মাস্ক না পরার নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। সেসব বিবেচনা করে ও আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ন্যূনতম ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। এতে সকাল ১১ টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৫০ টাকা। মাস্ক না পরা আরও ২০ জনকে জরিমানার আওতায় আনা হয়নি। তবে তারা পরবর্তীতে মাস্ক পরে বের হওয়ার লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন।

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়