ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

থামেনি বুড়িগঙ্গা দখল

তানভীর হাসান
প্রকাশনার সময়: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৩২

হাতিরঝিল আদলে বুড়িগঙ্গার দু’ধার সাজানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল সরকার। এরই অংশ হিসেবে বুড়িগঙ্গাকে দখলমুক্ত করতে নেয়া হয় একটি প্রকল্প। এর পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-কে দেয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এরপর চলতি বছর ২৯ জানুয়ারি সোয়ারিঘাট থেকে দখল-দূষণ রোধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ ও পাউবো। টানা ৩ মাস চলে এ উচ্ছেদ অভিযান। এরপর হঠাৎ-ই থেমে যায় সব। ফলে নতুন করে শুরু হয়েছে বুড়িগঙ্গার বুক দখল উৎসব!

উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, কিছুতেই দমন করা যাচ্ছে না বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা-উপশাখার দখলবাজদের। একদিকে উচ্ছেদ হচ্ছে আরেকদিকে চলছে দখলের মহোৎসব। নদীর দক্ষিণ-পশ্চিমে শাখা-প্রশাখার দুই তীর অনেকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর যারা দখল করছেন তারা এলাকার প্রভাবশালী। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী। তাদের ভয়ে প্রশাসনও তটস্থ থাকে। দখল করা জায়গায় গড়ে উঠেছে পার্ক, বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পুরান ঢাকার লালবাগ, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের কোলঘেঁষা বুড়িগঙ্গার শাখা নদীর বেশিরভাগ জায়গায়ই দখলে আছে। এক সময়ের শাখা নদীতে পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্ট্রিমার, ইঞ্জিনবোটসহ বড় বড় নৌযান চলাচল করত। খর¯্রােতা বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ের শব্দ বহুদূর থেকে শোনা যেত। এখন আর কিছুই শোনা যায় না। সাড়ে সাত কিলোমিটারজুড়ে জমি অবৈধভাবে দখল করে ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ছোট-বড় স্থায়ী-অস্থায়ী নানা স্থাপনা।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সুপরিকল্পিতভাবে বুড়িগঙ্গায় দখল হওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করে মাস্টারপ্ল্যান করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। যদিও মাস্টারপ্ল্যানটি নানা কারণে বাধার সম্মুখীন। বুড়িগঙ্গার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অবৈধ দখলকৃত সব স্থাপনা উদ্ধার করে পুনর্খনন করার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। ইতোমধ্যে দু’পাশের নদীর জমির সীমানাও চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত জমিকে কাজে লাগাতে নদীর দুই পাড়কে নাগরিকদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তৈরি করতে হাতিরঝিলের আদলে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। একইসঙ্গে আদি বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর আশপাশের সব নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে নৌপরিহবন প্রতিমন্ত্রীসহ ঢাকার দুই মেয়রকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। ইতোমধ্যেই সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক সংশোধিত নতুন ডিটেইল এরিয়া ম্যাপ (ড্যাপ) এ সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে কারিগরি ও কৌশলগত সব সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের বারবার কঠোর নির্দেশের পরও বুড়িগঙ্গার এই আদি চ্যানেলটি প্রতিনিয়তই দখল হচ্ছে। জলাধার সংরক্ষণ আইনের বিধি উপেক্ষা করে প্রায় তিন যুগ ধরে চলা দখলযজ্ঞে ইতোমধ্যেই চ্যানেলের শাখা নদীর প্রায় ৩৫০ একর জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এই দখল প্রক্রিয়ার কৌশল হিসেবে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ও বালু ফেলে ভরাট করে নদীর বুক সংকুচিত করা হয়। পরে এসব জায়গায় গড়ে তোলা হয় শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, পার্কও রিকশা-ট্রাকস্ট্যান্ড।

এমনকি দখল পাকাপোক্ত করার জন্য কৌশলে মসজিদও নির্মাণ করা হয়। এর আগে নদীর বুক দখল করে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রও ও নিচু করে গড়ে তোলা হয় কয়েকটি পাকা ব্রিজ। যাতে নৌপথ ও ইঞ্জিন বোট যেন না চলতে পারে। এরপর নদীর বুক বালু ভরাট করে দখলের মহোৎসব চলে। সেটি এখনো থেমে নেই। সেখানে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি করে সাপ্তাহিক বা মাসিক হারে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে সংঘবদ্ধ চক্র। মাঝে মধ্যে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল রক্ষায় নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। অভিযানে স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়ায় আবার দখলবাজদের রাহুগ্রাসে চলে যায় বুড়িগঙ্গা।

সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, বাবুবাজার ব্রিজ থেকে গাবতলী পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণ-পশ্চিমের বেড়িবাঁধের কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ-পশ্চিমের শাখা নদীর লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুরে বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় ২৪ হাজার ৫শ’ কাঠা (৩৫০ একর) একর বেদখল ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। লালবাগ-চকবাজারের বেড়িবাঁধসংলগ্ন কামালবাগ-আলীরঘাট, শহীদনগর, আমলীগোলা, কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ ঠোঁটা থেকে বেড়িবাঁধ ঘেঁষা লোহারপুল, রহমতবাগ, ব্যাটারিঘাট, কুড়ারঘাট, পূর্বরসুলপুর, নবাবগঞ্জ সেকশন, কোম্পানীঘাট পাকা ব্রিজ ঘেঁষা বালুমাটি আর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলে নদী ভরাট করে দোকানপাট, ট্রাক-লেগুনাস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। লালবাগ বড় মসজিদ ঢাল ও পূর্ব রসুলপুর ২ নম্বর গলির সংযোগ হাফেজ মূসা ব্রিজ, নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীরচর রনি মার্কেটের সংযোগস্থলে নির্মিত পাকা ব্রিজ ঘেঁষা বিশাল এলাকা দখল করে মার্কেট ও বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। আমলীগোলাঢাল সংলগ্ন বেড়িবাঁধ ঘেঁষা বুড়িগঙ্গার বুকে ময়লা-আর্বজনা ফেলে স্তূপ করে সেখানে ট্রাকস্ট্যান্ড, পাশের নদীর বুকে পুরো দখল করে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নদীর বুক দখল করে ৫ তলা পাকা দালান, টিনশেড বাড়িঘর বানানো হয়েছে। নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীরচর রনি মার্কেটের সংযোগস্থলের পাশে আদি চ্যানেলের বুকে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করায় পশ্চিমে নদী দখলের মহোৎসব চলছেই। বক্স কালভার্টে বর্জ্য ফেলায়, দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গা এখানে মৃতপ্রায়। বুড়িগঙ্গার আদি এ চ্যানেলে রিকশার গ্যারেজ থেকে শুরু করে টেম্পোস্ট্যান্ড, অবৈধ মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাড়িঘর, এমনকি মসজিদ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে।

এছাড়া কোম্পানিঘাটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের চারপাশে নদীর বিশাল জায়গা দখল করে একটি কোম্পানির বলপেন তৈরির কারখানা, কোম্পানি ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবিত শিশু বিনোদন কেন্দ্র, জামে মসজিদ ও ব্যাটারি ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়েছে। বছরের পর বছর এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা দখলবাজি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো খুব একটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে না। তাছাড়া কামরাঙ্গীরচর-হাজারীবাগের সেকশন বেড়িবাঁধসংলগ্ন শাখা নদীর দু’পাশে সেমিপাকা ঘর, দোকান, গ্যারেজ বানানো হয়েছে। এসব দোকান থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব দখল-দূষণ আর চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত রয়েছে এলাকার অনেক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। এভাবে বেওয়ারিশ লাশের মতো বুড়িগঙ্গার বুক বালু দিয়ে ভরাট করে রাতারাতি দখল করে নিচ্ছে চিহ্নিত দখলবাজরা। প্রশাসনের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে তারা মালিকানা কাগজপত্র বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করার পর তা দখলে নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে সটকে পড়ছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান জানান, বুড়িগঙ্গার পশ্চিমের শাখা নদীতে পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, স্ট্রিমার, ইঞ্জিন বোটসহ বড় বড় নৌযান চলাচল করত। স্রোতের কলধ্বনি এক থেকে দুই মাইল দূর থেকে শোনা যেত। অথচ মাত্র তিন যুগের ধরে দখলে বুড়িগঙ্গা এখানে শীর্ণকায়। চকবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীচরের মধ্য দিয়ে গত শতকের মাঝামাঝিও বুড়িগঙ্গায় স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো।

তিনি জানান, লালবাগ নবাবগঞ্জ পার্কসংলগ্ন বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলটি রীতিমতো দখল হয়ে গেছে। আগে এখানে লঞ্চ, স্ট্রিমার, ইঞ্জিন বোট নোঙর করত। সরকারের সৎ ইচ্ছা থাকে। স্বল্প খরচেও করা যায়। ড্রেজিং দরকার হয় না। এসভেটর দিয়ে মাটি তুলে নদী ¯্রােতে ধারা ফিরিয়ে আনা যায়।

সূত্র মতে, আশির দশক থেকে বুড়িগঙ্গার বুক ভরাট করে ঘরবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়ে। ’৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছন (দক্ষিণ) থেকে লালবাগের নবাবগঞ্জ হাজারীবাগ, এমনকি মিরপুরের গাবতলী হয়ে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করায় বাঁধের ভেতরে বুড়িগঙ্গার বিশাল এলাকা পড়ে যায়। বুড়িগঙ্গায় দখলের মহোৎসব চলে জোট সরকার আমলে। এ সময় কতিপয় প্রভাবশালী বুড়িগঙ্গায় দখল প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করে দেয়। জোট সরকারের আমলে গাবতলী থেকে শুরু করে নবাবগঞ্জ সেকশন পর্যন্ত নদীর বুকে বালি বর্জ্য ফেলে ভরাট করে দখলে নেয় ভূমিদস্যুরা। তিন বছর আগে নদীর বুকে বাঁশ পুঁতে ঘেরাওয়ের সময় শ্রমিকদের হাতেনাতে ধরে থানা পুলিশ। এদের বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়।

জানা গেছে, গত বছরের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার দখল-দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সোয়ারীঘাট থেকে দখল-দূষণ রোধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ ও পাউবো। টানা ৩ মাস উচ্ছেদ অভিযান চললেও হঠাৎ থেমে যায়। এখানে নদীর বুক দখল করে গড়ে ওঠা অসংখ্য আবাসন ও শিল্পকারখানা উচ্ছেদ করা হয়নি।

সূত্র জানায়, ওইসব স্থান দখলমুক্ত করতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খসড়া মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তা ডিএনসিসিকে দেয়া হয়েছে। বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বিএসআরএফ সংলাপে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে জমি অবৈধভাবে দখল করে ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ছোট-বড় স্থায়ী-অস্থায়ী নানা স্থাপনা। বুড়িগঙ্গার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে অবৈধ দখলকৃত সব জমি পুনর্দখল করে চ্যানেলটিকে পুনর্খনন করা হবে। নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন