ঢাকা | শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮

জামায়াত বিপদে বিএনপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশনার সময়

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৪৭

জামায়াতের সঙ্গে রয়েছে বিএনপির গভীর সম্পর্ক। যদিও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থনের চেষ্টায় কৌশলগতভাবে এখন একলা চলো নীতিতে চলছে বিএনপি। এ কারণে দৃশ্যত কর্মসূচি থেকে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।

অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতের কারণে বিএনপি প্রভাবশালী দেশগুলোর সহযোগিতা পাচ্ছে না। ধর্মীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগও আসছে দলটির ওপর। এ পরিপ্রেক্ষিতেই দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এমন অবস্থায় আফগানিস্তানে আবার তালেবান উত্থান ঘটেছে। ফলে দেশের মৌলবাদীদের নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বিএনপিকে। ভাটা পড়ছে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়টিও। ফলে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব, না সখ্য বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে।

প্রতিবেশী দেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিএনপির বাধা জামায়াত। আন্তর্জাতিক মহলেও বন্ধুশূন্য হচ্ছে দলটি। তারপরও জামায়াতকে ছাড়া বা জোটে রাখা নিয়ে বিএনপির কৌশল এখনো স্পষ্ট নয়। জোট রাখলেও বিএনপির বিপদ, না রাখলেও বিপদ। জামায়াতকে নিয়ে এখন অনেকটাই ‘নাবিক ছাড়া নৌকা’র মতো দিশাহীন অবস্থার মধ্যে পড়ছে দলটি। নয়া শতাব্দীর সঙ্গে আলাপকালে এমনটাই জানিয়েছেন দলের একাধিক সদস্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জন্মলগ্ন থেকেই ইসলামি মূল্যবোধের রাজনীতিকে অনেকটা এককভাবে ব্যবহার করত এবং এর সুবিধা পেত বিএনপি। এখন সে পরিস্থিতি নেই, বদলে গেছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। বদলে গেছে রাজনীতির নীতি-কৌশল। ২০০১ সালে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর তা এখন হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে দলটির জন্য। একটি মধ্যপন্থি দল হিসেবে বিএনপি যে ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলত, চারদলীয় জোট সরকারের সময় তা ‘ইসলামি মূল্যবোধে’ পরিণত হয়। মৌলবাদী রাজনীতি তথা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকায় ভালোভাবে নিচ্ছেন না দেশি-বিদেশিরা। বিএনপির ক্ষমতার আসার পথে এটিও অন্যতম বড় একটি অন্তরায়। তারপরও ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এখনো জামায়াতকে ছাড়তে ভয় পাচ্ছে।

অবশ্য তারা এও বলছেন, জঙ্গি ইস্যু ও ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতি কীভাবে দেখতে চায়- বিএনপি তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। আওয়ামী লীগ জঙ্গিবাদবিরোধী দল হিসেবে নিজেকে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত করে তুলেছে। অন্যদিকে, জামায়াত সঙ্গে থাকায় বিএনপিকে মৌলবাদী রাজনৈতিক দল হিসেবে নেতিবাচক প্রচারের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তারা।

চূড়ান্ত অর্থে জামায়াত কিন্তু বিএনপির বোঝা বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী নয়া শতাব্দীকে বলেন, তখন বিশ্ব প্রেক্ষাপট ছিল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। এখন গ্রে হয়ে গেছে। জামায়াতকে জোটে রাখার কারণে বিএনপি আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়েছে। তাদের সঙ্গে রেখে বিএনপি যে ভুল করেছে, সেখান থেকে এখন বেরিয়ে আসা উত্তম। তাতে নেতিবাচক ধারণাটা কেটে যাবে।

দলীয় সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক মহলের নেতিবাচক ধারণা কাটাতে অতিমাত্রায় ‘ইসলামীকরণের’ দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপিকে মধ্যম পন্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। এর অংশ হিসেবে বিএনপি কয়েক বছর ধরে ইসলামপন্থিদের সঙ্গে একধরনের দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এ কারণে অনেক ইসলামি দল বিএনপিজোট থেকে সরে যায়। সর্বশেষ জোট ছাড়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোট ২০১৬ সালে বিএনপি জোট ছেড়ে যায়। আর শায়খুল হাদিসের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ে তারও অনেক আগে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও বিএনপির সম্পর্ক এখন ততটা সাবলীল নয়। এখন বিএনপি জোটে নিবন্ধিত ইসলামি দল বলতে আছে একমাত্র খেলাফতে মজলিস। এর বাইরে যে কয়টা ইসলামি দল জোটে আছে, সেগুলো মূলত বেরিয়ে যাওয়া দলগুলোর খ-িত অংশ। এর মধ্যে মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসও জোট ছাড়তে পারে বলে গুঞ্জন আছে। কারণ, দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের গত মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মামলায় এখন কারাবন্দি। তাকে মুক্ত করতে কেউ কেউ বিএনপির জোট ছাড়ার কথা ভাবছেন। যদিও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়ার পর দলটির নেতারা মুক্তি পান। জোট ছাড়ার পর সব দলই ‘অবহেলার’ অভিযোগ তুলে বিএনপিকে দোষারোপ করছে। অন্যদিকে বিএনপি জোট ছাড়ার পর এ দলগুলোর সঙ্গে সখ্য বাড়ছে সরকারের। আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে, আলেমদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চর্চার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিকেও ভালোভাবে ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগ।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, এখন ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ নেই। এখন যুদ্ধ অর্থনীতির, পারস্পরিক স্বার্থের। তালেবানের সঙ্গে আমেরিকা বসতে পারলে, হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় এসে অসাম্প্রদায়িক হতে পারলে বিএনপির ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে সমস্যা কী?

অবশ্য বিএনপির নেতা ও দলের শুভাকাক্ষীদের একটি অংশ মনে করেন, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপির ওপর ধর্মীয় শক্তিগুলোর বড় ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছে। যার প্রভাবে বিএনপি ‘ডানপন্থির বামে, বামপন্থির ডানে’ বলে যে দাবি করত, তা হারিয়ে যায়। উদার গণতান্ত্রিক ভাবধারার অবস্থান থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে দলটির ভেতর।

দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতকে নিয়ে দলের নীতি-নির্ধারকরা সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গ ছাড়া নিয়ে বিএনপির ভেতর বিরাজ করছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বিএনপির ভয় জামায়াতকে সরকার ব্যবহার করতে পারে। ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তির কথা মাথায় রেখে জামায়াতসঙ্গ ছাড়ার ব্যাপারে দলের হাইকমান্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচন পর থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে চলছে বিএনপির টানাপড়েন। ভবিষ্যতে ভোটে জোটগতভাবে পথচলা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন নেতাকর্মীরা।

দলটির একাধিক নেতা বলেন, প্রতিষ্ঠাকালে ভারত-চীন, রাশিয়াসহ অনেক ক্ষমতাধর আন্তর্জাতিক শক্তিকে পাশে পেয়েছিল বিএনপি। এখন সে পরিস্থিতি আর নেই। দলের কিছু প্রতিক্রিয়াশীল নেতার কারণে জোটে এখনো জামায়াত। আর তাদের জন্যই বিএনপি এখন ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের দল হিসেবে পশ্চিমাদের কাছে পরিচিত। এই পরিচিতির কারণে বিশে^ প্রায় বন্ধুহীন এখন দলটি। বিশেষত ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো এখনো নেতিবাচক।

তারা আরো বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি তার একক সত্তা হারিয়ে ‘বিএনপি-জামায়াত’ বা ‘বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং হয়। এমন নানা ঘটনায় বন্ধুসুলভ দেশগুলোর সঙ্গে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়, যা এখনো পরিবর্তন হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভাইস চেয়ারম্যান নয়া শতাব্দীকে বলেন, বিএনপির বর্তমান দুরবস্থার জন্য জোটসঙ্গী জামায়াতেরও দায় আছে। দেশ-বিদেশে সমালোচনা শুনতে হয়। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ না থাকলে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আরো ভালো থাকত এবং মজবুত হতো।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান নয়া শতাব্দীকে বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সব বিষয়ে আলোচনা হয়। জামায়াতকে ছাড়া ও রাখার পক্ষে-বিপক্ষে দলের ভেতরের অনেক আগে থেকেই আলোচনা হচ্ছে। তবে এটা একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, আবার জামায়াত ছাড়লে আওয়ামী লীগও তাদের কাছে টেনে নেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়। সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের আন্দোলনের জন্য দলকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটা দলগত সিদ্ধান্ত, দলই সিদ্ধান্ত নেবে।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x